যানজটের বদলে মহাসড়কে জনজট

বিশেষ প্রতিনিধি : ঈদযাত্রায় ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চলাচল না করায় মহাসড়কের স্থানে স্থানে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বেড়ে গেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই এ ভিড় শুরু হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, কালিয়াকৈর উপজেলার শিল্পকারখানা অধ্যুষিত চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঈদে অন্য বছরগুলোতে যানজট থাকলেও এবার তা নেই।

তবে গাড়ি সঙ্কটে সেখানে এবার সৃষ্টি হয়েছে জনজটের। করোনা মহামারীর কারণে দূরপাল্লার বাস চলাচলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার এ সঙ্কট সৃষ্টি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক কারখানায় ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার ভোর থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় হাজারো ঘরমুখো মানুষ যানবাহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। করোনার মহামারীর ভয় তাদের কারো মধ্যেই যেন নেই। বিধিনিষেধের আওতার যেসব যানবাহন চলছে সেগুলোতে উঠে বাড়ি ফেরার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে।

কেউ ট্রাকে, কেউ মাইক্রোবাসে, কেউবা মোটরসাইকেল ভাড়া করে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছেন। কাউকে কাউকে পায়ে হেঁটেও গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা গেছে, সামনে থেকে কোনো যানবাহনে ওঠার আশায়। মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সকালে এক পরিবারের কয়েকজন চন্দ্রার দিক থেকে পায়ে হেঁটে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দিকে যাচ্ছেন। গাড়ি না পেয়ে তারা সামনের দিকে এগুচ্ছেন গাড়ি পাওয়ার আশায়। তাদের মধ্যে একজন বশির মিয়া জানান, তিনি স্বপরিবারে থাকেন গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ি এলাকায়। সেখানে তিনি কাঁচামালের ব্যবসা করেন।

তিনি গাড়ি সঙ্কটের চিন্তা করে আগেভাগেই স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার জন্য মঙ্গলবার ভোর থেকেই চন্দ্রায় বাস কাউন্টার এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সকাল ১০টার দিকেও তাদের কোনো গাড়িতে পাঠাতে পারেননি। দূরপাল্লার কোনো বাস না থাকায় সেখানে যাত্রীদের জট সৃষ্টি হয়েছে। পরে সামনে বিকল্প কোনো গাড়ি পাওয়া যায় কিনা সে আশায় তাদের নিয়ে গন্তব্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানাধীন মাকসুদ ফ্যাশন কারখানার অপারেটর হারুন মিয়া স্বস্ত্রীক থাকেন তারগাছ এলাকায়।

সেহরি খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে অটোরিকশয় একশ’ টাকা ভাড়া দিয়ে চন্দ্রা পৌঁছেন। তিনি সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, তিনি যাবেন রাজশাহীতে। চন্দ্রা এসে সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছেন, কোন যানবাহন পাচ্ছেন না। কিভাবে যাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা উপায় হয়ে যাবে। বাস যদি না পাই তাহলে ট্রাকে উঠে চলে যাবো। যত কষ্টই হোক বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করবো, এর চেয়ে অন্য কোনো আনন্দ নেই। হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। করোনায় ভয় করি না, যা হয় হবে। কোনাবাড়ি এলাকার এক কারখানা শ্রমিক হাবিব হোসেন বলেন, দশ দিনের ছুটি পেয়েছি। এতোদিন এখানে থেকে কি করবো। তাই যেভাবেই হোক বাড়িতে যাবোই।

কোনাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এক হোটেলের বাবুর্চি মর্জিনা আক্তার জানান, চাকরির কারণে বেশিরভাগ সময় বাড়িতে যেতে পারি না। তাই বলে ঈদের সময় বাড়ি যাবো না, তা কি হয়। তাই কষ্ট হলেও বাড়িতে যাবো। গাজীপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের উপর দিয়ে দূরপাল্লার আন্তজেলার কোনো বাস চলাচল করছে না। তবে লোকাল যাত্রীবাহী বাস, কিছু ট্রাক-পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে। চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যাত্রীবাহী পরিবহন না পেয়ে মানুষের জট লেগে আছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে ওই জট শুরু হয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো ঘরমুখো মানুষের চাপও বাড়তে থাকে। কিছু কারখানা ছুটি হয়ে যাওয়া শ্রমিকরা বাড়ি যাওয়ার জন্য চন্দ্রায় অপেক্ষা করছে। তিনি জানান, বিকালের পর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ঘরমুখো মানুষের চাপ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবহনের কোনো জটলা যাতে সৃষ্টি না হয়, সেজন্য পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। আগের মতোই চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় কন্ট্রোলরুম ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।

সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, মহাসড়কে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। মহাসড়কে কোনো যানজট নেই, তবে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ঘরমুখো মানুষের অনেক ভিড় রয়েছে। তবে আমরা যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সতর্ক করছি। গাজীপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক (উত্তর) সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মেহেদী হাসান জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা-চৌরাস্তা মোড় এলাকায় ঘরমুখো মানুষের চাপ রয়েছে।

দূরপাল্লার বাস চলতে দেয়া হচ্ছে না। লোকাল বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা করেই তারা গন্তব্যে ছুটছে। তিনি আরও জানান, টঙ্গীর কোনাবাড়ি এলাকায় মহাসড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজের কারণে রাস্তায় যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সেখানে গাড়ির চাপ বেড়ে গেছে। তবে মহাসড়কে কানেক্টডে এলাকার রোডগুলো থেকে ট্রাক, পিক-আপ, কভার্ডভ্যান ও কিছু বাস পালিয়ে যাত্রী পরিবহনের চেষ্টা করছে। আমারা সেগুলোর দিকে কড়া নজর রেখেছি।