সচেতনতাই পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে!

0
252

রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্রী সারিতা। পড়া-লেখায় মন দিতে পারছে না। বইয়ের পাতা ওল্টালেই সেখানে তার মায়ের মুখখানা ভেসে ওঠে। চোখের পাতা ভিজে আসে। চিৎকার করে কাঁদতেও পারে না। একবছর আগে একমাত্র সন্তান সারিতাকে ছেড়ে মা নাবিলা চলে গেছেন মৃত্যুর ওপারে।
দূরারোগ্য স্তন ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে হেরে যান নাবিলা। রোগটার ধরা পড়েছিল বেশ দেরি করে। মায়ের চিকিৎসার কমতি রাখেননি বাবা। বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। তাই, মায়ের কষ্টের কথা মনে করে সে হাজির হয়েছিল রাজধানীর শাহবাগের মোড়ে ১০ অক্টোবর স্তন-ক্যান্সার সচতেনত দিবসের সমাবেশে।
তবে, সোয়েব আর রাসেল-এই দু’ভাইয়ের কাহিনীটা সারিতার চেয়ে ভিন্ন। ওদের মা সুরাইয়া পারভীনেরও ক্যান্সার ধরা পড়েছে, তবে, তা ছিল প্রাথমিক অবস্থায়। সে কারণে, উপযুক্ত চিকিৎসায় নিয়ে গত চার বছর ধরে তিনি বেশ সুস্থ জীবন যাপন করছেন।
সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে বাংলাদেশের নারীরা প্রকাশ্যে স্তন শব্দটি উচ্চারণ পর্যন্ত করতে চান না, ফলে, শরীরে প্রাথমিক কোন লক্ষণ দেখা গেলেও তারা তা গোপন রাখেন। যে কারণে, বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে।
তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিও পাশাপাশি স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু হওয়ার কারণে এখন আগেভাগেই রোগ ধরা পড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে, সঠিক ও পূর্ণ চিকিৎসায় শতকরা ৯০ জনই সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার জানান, স্তন ক্যান্সারে শুধু নারীরা নন, পুরুষেরাও আক্রান্ত হতে পারেন। তবে, নারীদেও ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে, যেহেতু বাংলাদেশে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতার অভাব আছে। ফলে, দেখা যায়, যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বেশির ভাগই প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা নেন। কারো স্তনের বোঁটা দিয়ে দুধের মত সাদা রস নিঃসৃত হতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা বা স্তন লাল রঙ হয়ে গেছে এমন লক্ষণ নিয়ে এলে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব এবং সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু সে অবস্থা নিয়ে খুব কম রোগীই আসেন।
স্তন ক্যান্সারে নারীদেও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এতোদিন এই ক্যান্সারের ব্যাপারে নারীদের সচেতন করার জোরটা ছিল বেশি, কিন্তু এখন পুরুষদেরকেও সচেতন করার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যদিও পুরুষদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ক্যানসার নিরাময়যোগ্য। তবে, আমাদের সমাজে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষকে এখনো রোগের পাশাপাশি লড়াই করতে হয় সমাজের সঙ্গে। এ সময়ে খুব প্রয়োজন কাছের মানুষদের আন্তরিক সহযোগিতা। সেটা পেলে লড়াইটা হয় সহজ।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. নাজনীন নাহার বলেন, দেরিতে সন্তান গ্রহণ, আবার যাদের সন্তান নেই, বা সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি বা ফলমূলের চাইতে চর্বি ও প্রাণীজ আমিষ বেশি থাকলে এবং প্রসেসড ফুড বেশি খেলে, এবং অতিরিক্ত ওজন যাদের তাদেরও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। স্তন ক্যান্সারে যতজন আক্রান্ত হন তাদের ৮০ ভাগেরই বয়স হচ্ছে ৫০-এর ওপর। সেই সঙ্গে যাদের পরিবারে কারোর স্তন ক্যান্সার রয়েছে তাদেরও এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি থাকে।
এই কারণে, ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সী নারীদের প্রতি তিনবছর পর পর ব্রেস্ট স্ক্রিনিং বা ম্যামোগ্রাম করানো উচিত। আর এই পরীক্ষার জন্য মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। ম্যামোগ্রাম হচ্ছে এক্স-রে’র মাধ্যমে নারীদের স্তনের অবস্থা পরীক্ষা করা। সাধারণত প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার এতো ছোট থাকে যে বাইরে থেকে সেটা বোঝা সম্ভব হয় না। কিন্তু ম্যামোগ্রামের মাধ্যমে খুব ছোট থাকা অবস্থাতেই বা প্রাথমিক পর্যায়েই ক্যান্সার নির্ণয় করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার থেকে সুস্থ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে।

॥ শাহনাজ পলি ॥